গল্পটি জানলে আপনার চোখে পানি ধরে রাখতে পারবেন না

Sharing is caring!

Image may contain: 4 people, text

রাস্তায় ফেলে যাওয়া যুবকের পাশে( Shamim Ahmmed) ব্যাংক কর্মকর্তা।

মরার মতো পড়েছিলেন এক যুবক।
হাতে ব্যান্ডেজের মতো কালো বস্তু(ছালার বস্তা) দিয়ে বাঁধা। তার ওপর মাছি ভন ভন করছে,পোকা ধরেছে, দুর্গন্ধে কাছে যাওয়ার উপায় নেই। তবুও কাছে গেলেন এক ব্যাংক কর্মকর্তা। দাঁড়ালেন তার পাশে। নিয়ে গেলেন হাসপাতালে। করলেন চিকিৎসার ব্যবস্থা। তার কারণেই হারিয়ে যাওয়া ওই যুবককে খুঁজে পেলেন তার স্বজনরা।

হাসান (৩৫) নামের সেই যুবক এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) চিকিৎসাধীন। শনিবার তাকে ঢামেকের আর্থোপেডিক্স বিভাগ থেকে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্তানান্তর করা হয়েছে।

যমুনা ব্যাংকের ফার্স্ট এসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট শামীম আহমেদ জানান, গত ৩ সেপ্টেম্বর অফিস থেকে বাসায় যাওয়ার পথে দৈনিক বাংলার মোড়ে দেখেন,
এক ব্যক্তি পড়ে আছেন মরার মতো।
তার কাছে গিয়ে কথা বলেন শামীম আহমেদ। জানতে পারেন, হাসান নামের সেই যুবক মাস দুয়েক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে একটি হাত হারান। হাসানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে তিনি রাজি হন।
এরপর এম্বুলেন্স ডেকে সহকর্মী –
আলী, সাব্বির ও শফিকুল ইসলামের সহযোগিতায় হাসানকে (ঢামেক) নিয়ে যান শামীম আহমেদ।
সেখানে ভর্তি করান। ভর্তি করার ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার দেওড়া গ্রামের আরমান হোসেন খুব সহযোগিতা করেন। এরপর ফেসবুকের মাধ্যমে খুঁজে পান তার স্বজনদের।

হাসানের স্বজনরাও এসেছেন ঢামেকে। তারা হাসানের দেখাশুনা করছেন। আর চিকিৎসার খরচ দিচ্ছেন শামীম আহমেদসহ কয়েকজন। প্রতিদিন ব্যাংকের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় হাসপাতালে দেখতে যান হাসানকে।

 

Image may contain: 2 people, people smiling

 

হাসানের বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার নিজামপুর গ্রামে। বাবা নেই। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে হাসান চতুর্থ। ঢাকাতে তিনি পাইলিংয়ের কাজ করতেন। মাস দুয়েক আগে গাজীপুর চৌরাস্তায় মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় হাসান হাতে আঘাত পান। কয়েকজন লোক তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। দুর্ঘটনার পর থেকে হাসানকে তার পরিবারের লোকজন খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

উত্তরায় ভর্তি করার পর হাসানের বাম হাতের কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়। এসময় কয়েকজন ব্যক্তি হাসানের হাতের অবস্থা দেখিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা তোলেন। তবে সেই টাকা হাসানের কোনো উপকারে আসেনি। যারা টাকা তুলেছেন, তারাই সব টাকা নিয়ে হাসানকে রাস্তায় ফেলে রেখে গেছেন। এরপর হাসান বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বাড়ি যেতে না পেরে এখানে ওখানে ঘুরে ঘুরে দৈনিক বাংলা মোড়ে এসে সুরমা টাওয়ারের নিচে সিঁড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে তাকে দেখতে পান ব্যাংকার শামীম আহমেদ।

হাসান জানান, তিনি বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু হাতে দুর্গন্ধের কারণে তাকে বাসে তোলা হয়নি। তিনি ট্রেনেও ওঠেন, সেখান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। ট্রেনের ছাদে ওঠেন, সেখান থেকেও নামিয়ে দেওয়া হয়।

শামীম আহমেদ বলেন, আমরা যখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই, দুর্গন্ধে তার কাছে যাওয়া আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনবার ড্রেসিং করা হয়েছে। তার রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গিয়েছিল। চার ব্যাগ ও নেগেটিভ রক্ত দেওয়া হয়েছে। আরো দুই ব্যাগ রক্ত লাগবে। কয়েকজন ফেসবুক বন্ধুও তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। যে যার সামর্থ অনুযায়ী সহযোগিতা করছেন।

তিনি বলেন, প্রথম রাতে হাসানের কাছে কাউকে রাখতে পারিনি। আমি ও সহকর্মী আলী সাব্বির রাত ২টা পর্যন্ত তার কাছে ছিলাম। আমাদের নিজস্ব একজন সেবিকা আছেন, তিনি মানসিক হাসপাতালে একজন রোগীর সাথে ছিলেন, তাকে (সেবিকা) সেখান থেকে আমরা নিয়ে আসি। হাসানের পরিবারের লোকজন আসার আগ পর্যন্ত সেই সেবিকা তার দেখাশুনা করেছেন।

হাসানকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে ভর্তি করা হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর তার ভাই তাকে বুঝে নেন।
৪ সেপ্টেম্বর হাসানকে ভর্তি করা হয় আর্থোপেডিক্স বিভাগে। সেখান থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর তাকে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনিস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়েছে।

শামীম আহমেদ আরো বলেন, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক হলে হাতে অস্ত্রোপচার করা হবে। আশা করি, হাসান অল্প দিনে সুস্থ হয়ে যাবে। সে সুস্থ হলে আমরা তাকে তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব।

দীর্ঘদিন থেকে শামীম আহমেদ এরকম অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তিনি মনে করেন, মানুষ মানুষেরই জন্য।
আমাদের সকলের উচিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

Facebook Comments
shares